"Bangla Islamic Articale" হলো বাংলাভাষী পাঠকদের জন্য কুরআন, সহীহ হাদীস ও নির্ভরযোগ্য স্কলারদের মতামতের ভিত্তিতে লেখা একটি জ্ঞানকোষ। আকীদা, ফিকহ, সীরাত, জীবনযাপন এবং সামাজিক বিষয়াবলির উপর মানসম্মত প্রবন্ধ পড়ুন। পিডিএফ (PDF) বই এবং প্রবন্ধ ডাউনলোডের সুবিধা সহ ইসলামকে জানুন, বুঝুন ও দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োগ করুন।

Full-Width Version (true/false)

মঙ্গলবার, ১০ আগস্ট, ২০২১

ইসলামে হিজরি সনের গুরুত্ব

 ★★ ★★★★ ★★  ইসলামে হিজরি সনের গুরুত্ব ★★ ★★★★ ★★

             অধ্যক্ষ শাহ মোহাম্মদ মহিউদ্দিন                                                                                                                  ★★ ভূমিকাঃ সময়ের বিবর্তনে- কালের আবর্তে আমাদের মাঝে আবারো উপস্থিত হিজরি সন ১৪৪৩। বর্ষপঞ্জি বা মুসলিম বর্ষপঞ্জি বা হিজরী বর্ষপঞ্জি এটি মূলত একটি চন্দ্রনির্ভর বর্ষপঞ্জি। বিভিন্ন মুসলিম দেশ এই বর্ষপঞ্জি অনুসরণ করে, আর পৃথিবীব্যাপী মুসলমানগণ অনুসরণ করেন ইসলামের পবিত্র দিনসমূহ উদযাপনের জন্য। হিজরি সনের সংগে মুসলিম উম্মাহর আদর্শ-ঐতিহ্য, তাহজিব-তামাদ্দুন সম্পৃক্ত। যার সংগে জড়িত আছে বিশ্বমানবতার মুক্তির অমর কালজয়ী আদর্শ রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর প্রিয় ও পুণ্যময় জন্মভূমি মক্কা ত্যাগ করে মদিনায় হিজরতের ঐতিহাসিক ঘটনা।                                                           ★★হিজরত ও হিজরি সনঃ হিজরত অর্থ ত্যাগ করা বাএক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়া। আল্লাহ তায়ালার নির্দেশে রাসূল (সাঃ) ও সাহাবাদের (রা.)মক্কা নগরী ত্যাগ করে ইসলামের প্রচার ও প্রসারের জন্য মদিনায় চলে যাওয়াকেই হিজরত বলে অবহিত করা হয়। রাসূল (সাঃ)আল্লাহর নির্দেশে ৬২২ খ্রিস্টাব্দের ১২ সেপ্টেম্বর মোতাবেক ২৭ সফর মক্কা মুকাররামা থেকে মদিনার উদ্দেশে হিজরত করেন। ২৩ সেপ্টেম্বর ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মোতাবেক ৮ রবিউল আউয়াল কুবায় পৌঁছেন। তিনি ২৭ সেপ্টেম্বর ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মোতাবেক ১২ রবিউল আউয়াল মদিনা মুনাওয়ারায় পৌঁছেন। রাসূল (সাঃ)। এর হিজরতেরই স্মৃতিবহন করে আসছে হিজরি সন।                                                                                                                             ★★হিজরি সনের সূচনাঃ হিজরি বর্ষ পূর্ণতা লাভ রাসূল (সাঃ) এর সময়কাল থেকেই। বিক্ষিপ্তভাবে হিজরি বর্ষ গণনা আরবি বর্ষপঞ্জি তথা হিজরি সনের প্রথম মাস মুহাররম।  আর পহেলা মুহাররম হলো হিজরি নববর্ষ।

★★হিজরি সন প্রবর্তনঃ ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা ওমর (রা:)-এর শাসনামলে ১৭ই হিজরী অর্থাৎ রাসুল (সাঃ) এর ইনতিকালের সাত বছর পর চান্দ্র মাসের হিসাবে এই পঞ্জিকা প্রবর্তন করা হয়। হিজরতের এই ঐতিহাসিক তাৎপর্যের ফলেই হযরত ওমর (রা.) এর শাসনামলে যখন মুসলমানদের জন্য পৃথক ও স্বতন্ত্র পঞ্জিকা প্রণয়নের কথা উঠে আসে তখন তাঁরা সর্বসম্মতভবে হিজরত থেকেই এই পঞ্জিকার গণনা শুরু করেন। যার ফলে চান্দ্রমাসের এই পঞ্জিকাকে বলা হয় ‘হিজরী সন’। হজরত ওমর (রাঃ) এর খিলাফতের সময় তা সুনির্দিষ্ট রূপে প্রকাশিত ও বাস্তবায়িত হয়। সে সময় রাষ্ট্রীয় কাজে সন তারিখ ব্যবহৃত না হওয়ায় প্রশাসনিক সমস্যা সমাধানকল্পে ১৭ হিজরির ১০ জমাদিউল আউয়াল সাহাবায়ে কেরামদের মজলিসে শুরায় সবার পরামর্শক্রমে রাসূল (সাঃ) এর হিজরতকে ভিত্তি করে হিজরি সন গণনার সিদ্ধান্ত নেন।’ পৃথিবীর ইতিহাসে মুসলমানদের উন্নতি, অগ্রগতি, বিজয় ও সাফল্যের প্রতীক ও শ্রেষ্ঠ তৌহিদী বিপ্লব ছিল হিজরত। সে কারণেই হিজরতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে হিজরি সন গণনা শুরু হয়।                                                                                        ★★মুহাররম দ্বারা হিজরি সন শুরুঃ রাসূল (সাঃ) যখন মদিনা মুনাওয়ারায় আসেন, তখন মাসটি ছিল রবিউল আওয়াল। হজরত ওমর (রাঃ) হিজরি সনের প্রথম মাস ধরেন মুহাররমকে। যদিও রাসূল (সাঃ) মদিনায় পৌঁছেন রবিউল আউয়াল মাসে। কিন্তু হিজরতের পরিকল্পনা হয়েছিল জিলহজ মাসে নবুওয়াতের ১৩তম বর্ষের হজের মৌসুমে মদিনার আনসারি সাহাবায়ে কেরামের আকাবার দ্বিতীয় শপথ সংঘটিত হওয়ার পর। মুসলমানদের হিজরতকারী প্রথম দলটি মদিনা মুনাওয়ারায় পৌঁছেন মুহাররম মাসে। এ হিজরত ছিল রাসূল (সাঃ) এর মদিনায় হিজরতের শুভ সূচনা। ★তাছাড়া আরবি বর্ষ গণনায় বিভ্রান্ত লক্ষ্য করে স্বয়ং আল্লাহ্-এর সংশোধনের জন্য একটি আয়াত নাযিল করেন। আয়াতে হিজরি সনের ১ম মাস মহররম, সপ্তম মাস রজব, ১১তম মাস জ্বিলকদ আর ১২তম মাস জিলহজ বলে উল্লেখ আছে। যা ১০ হিজরিতে অবর্তীন হয়। 

 ★★হিজরী সনের গুরুত্বঃ  হিজরী সন ও তারিখের গুরুত্ব মুসলিম জীবনে অনস্বীকার্য। ★ হিজরি সনের গুরুত্ব বর্ননা করে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন- “লোকেরা  আপনাকে নব চাঁদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে,আপনি বলুন, তা হলো মানুষের এবং হজের জন্য সময় নির্ধারণকারী।” ( সূরা : বাকারা,১৮৯) এ আয়াত দ্বারা স্পষ্ট বুঝা যায় যে, আল্লাহ তায়ালা বান্দাদের হিসাব নিকাশের সুবিধার্থে চাঁদকে পঞ্জিকাস্বরূপ সৃষ্টি করেছেন। আর এজন্যই হিজরি সন গণনাকে ফরযে কেফায়া হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। ★ হিজরি সনের সাথে জড়িত আছে বিশ্বমানবতার মুক্তির অমর কালজয়ী আদর্শ রাসূল (সাঃ) এর প্রিয় ও পুণ্যময় জন্মভূমি মক্কা ত্যাগ করে মদিনায় গমনের ঐতিহাসিক ঘটনা। ★ হিজরী সনের সাথে সম্পৃক্ত বিশ্ব মুসলিমের তাহজীব-তামাদ্দুন। যার সংগে মানব সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই বর্ষ গণনার উদ্ভব ঘটেছে। এ সময় গণনায় মানুষ চাঁদের গতি ও প্রকৃতির প্রতি নজর রেখেছে। মহান আল্লাহ কুরআনে বলেন-  “তিনিই সেই সত্তা যিনি সূর্যকে করেছেন দ্বীপ্তিমান তেজস্বী এবং চন্দ্রকেজ্যোতির্ময় আলোকোজ্জ্বল করেছেন। আর ওর (চন্দ্রের গতির) জন্য কক্ষ বা মানজিলসমূহ নির্ধারিত করেছেন। যাতে তোমরা বছরসমূহের সংখ্যা গণনা ও সময়ের হিসাব জানতে পার”।(সুরা ইউনুস-৫)।                                                                        ★ রাসূল (সাঃ) এর সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ঘটনাবলী যেনন- বদর, উহুদ, খন্দক, হোদাইবিয়ার সন্ধি, খায়বর, মক্কা বিজয়,তাবুকসহ প্রভৃতি যুদ্ধ, রাজ্য জয় এবং অন্যান্য ঐতিহাসিক ঘটনাবলী হিজরি সনের সাথে সম্পৃক্ত।                                                                                                             ★ হিজরি সনের সাথে সম্পৃক্ত ইসলামের বিভিন্ন বিধি-বিধান রোজা, হজ, ঈদ, শবে বরাত, শবে কদর, শবে মিরাজসহ ধর্মীয় নানান আচার-অনুষ্ঠান। হাদীসে এসেছে-  “তোমরা চাঁদ দেখে রোযা রাখ এবং চাঁদ দেখে রোযা ভংগ কর”।(মুসলিম,১/৩৪৭)।                                                                                                                     ★ রাসুল (সাঃ)এর মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের ঘটনাকে চিরস্মরণীয় করে রাখার উদ্দেশ্যেই হিজরী সাল গণনার সূচনা।                                                                                                                                      ★একজন মুসলমানের জন্য অপরিহার্য হল- তার সকল কাজ কর্ম হিজরি সনের তারিখ অনুজায়ী সম্পন্ন করা।

বাংলাদেশী মুসলমানের জীবনে হিজরি সনের প্রভাবঃ ৫৯৮ হিজরি মোতাবেক ১২০৯ খ্রিস্টাব্দে ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজীর বংগ জয়ের পর থেকে বাংলাদেশে হিজরি সনের ব্যাপক প্রচলন ঘটেছে । এ সময় থেকে এখানে হিজরি সন রাষ্ট্রীয় মর্যাদা লাভ করে এবং জাতীয় সনে পরিণত হয়। পনের শতকের দিকের এ দেশের বিভিন্ন স্থাপত্যেরর গায়ে হিজরি সনের ব্যাপক ব্যবহার হয়েছিল। এক সময় মুসলমানদের দৈনন্দিন কাজে সন তারিখ গণনায় আগে হিজরি সন ব্যবহার করে তার পরে বাংলা ও ইংরেজীকে উল্লেখ করা হত। এ ধারা ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের ২৩ জুন পলাশীর যুদ্ধ পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। ঐতিহাসিকদের মতে, উপমহাদেশে প্রায় ৫৫০ বছর রাষ্ট্রীয়ভাবে হিজরি সন স্বীকৃত ছিল। ইংরেজ শাসনকালে বাংলাদেশ তথা ভারতীয় উপমহাদেশে ইংরেজি সনের প্রচলন হয়। কিন্তু বর্তমানে হিজরি সনের ব্যবহার নেই বললেই চলে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে ইসলামী বর্ষপঞ্জির প্রতি এতটা অবজ্ঞা সত্যিই দুঃখজনক। এখন একজন মুসলমান হিসেবে আমাদের ভেবে দেখা প্রয়োজন যে, পহেলা বৈশাখ তথা বাংলা নব বর্ষ, পহেলা জানুয়ারী তথা ঈসায়ী নব বর্ষে আমরা যেভাবে আনন্দ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করি ঠিক সেভাবে পহেলা মূহাররম তথা হিজরি নববর্ষে আমরাকি সেভাবে উচ্ছ্বাসিত হই? 

★★পরিশেষে...মুসলিম উম্মাহর জন্য চন্দ্র মাসের হিসাব রাখা প্রিয়নবি (সাঃ) ও খোলাফায়ে রাশেদা(রাঃ) এর সুন্নাত। যার অনুসরন, অনুকরণ করা মুসলিম উম্মাহর জন্য পূন্যময় ও কল্যাণকর আমল।আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে  চান্দ্র মাস ও হিজরি সনের যথাযথ ব্যবহার করার তাওফিক দান করুন। চন্দ্র মাসের নিয়মিত যাবতীয় আমল করে আল্লাহ নৈকট্য অর্জন করার তাওফিক আল্লাহ আমাদেরকে দান করুন। আমিন!!!

★বিশিষ্ট কলামিষ্ট ও লিখকঃ শাহ মোহাম্মদ মহিউদ্দিন, অধ্যক্ষ, ধামতী ইসলামিয়া কামিল মাদরাসা, দেবিদ্বার, কুমিল্লা।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Post Top Ad

Your Ad Spot

Pages

SoraTemplates

Best Free and Premium Blogger Templates Provider.

Buy This Template